Chilmari Upazila

চিলমারী উপজেলা বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। চিলমারী একসময় উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। ব্রিটিশ আমলে এই বন্দর দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচল করত এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহন হতো। চিলমারী বন্দরকে কেন্দ্র করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। পরবর্তীকালে নদীভাঙন, চর সৃষ্টি এবং ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা হ্রাসের কারণে বন্দরের কার্যক্রম অনেকটাই কমে যায়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নৌযান চলাচলের উপযোগী নাব্যতা বজায় রাখা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে চিলমারী নদীবন্দর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (BIWTA) প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় রয়েছে।

চিলমারী উপজেলা পরিচিতি

চিলমারী উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলাটি তার নামকরণ নিয়ে একটি কিংবদন্তি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলে চিলের উপদ্রব ছিল। চিল এত বেশি ছিল যে তারা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতো। চিলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ চিলের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। জনতাও আনন্দের সাথে সে যুদ্ধ উপভোগ করতে দলে দলে আসতে থাকে, আর মুখে একটাই রব “চলো চিল মারি”। ধারনা করা হয়, এই ঘটনা থেকেই এই এলাকার নাম চিলমারী হয়েছে। চিলমারী বন্দরের সাংস্কৃতিক গুরুত্বও রয়েছে। বিখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে জনপ্রিয় “ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে” গানটির মাধ্যমে চিলমারী বন্দরের নাম সারা দেশে পরিচিতি লাভ করে। চিলমারীর অষ্টমীর স্নান ধর্মীয় বিশ্বাস, শতবর্ষের ঐতিহ্য, ব্রহ্মপুত্রের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং গ্রামীণ মেলার সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল। অষ্টমী স্নানের সময় চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র তীর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী এখানে এসে নদীতে স্নান করেন এবং ধর্মীয় আচার পালন করেন। অষ্টমী স্নানকে কেন্দ্র করে এখানে ঐতিহ্যবাহী মেলাও বসে। মেলায় বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ পণ্য, খেলনা, মিষ্টি, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান বসে এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলন ঘটে। 

চিলমারী উপজেলা – cilmari upazila map

চিলমারী উপজেলার অবস্থান ও আয়তন

চিলমারী উপজেলার  আয়তন ২২৪.৯৭ বর্গ কিলোমিটার। এ উপজেলার উত্তরে উলিপুর উপজেলা, দক্ষিণে চর রাজিবপুর উপজেলা ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, পূর্বে রৌমারী উপজেলা ও চর রাজিবপুর উপজেলা, পশ্চিমে উলিপুর উপজেলা ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। চিলমারীর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও চরাঞ্চল এ উপজেলার ভূপ্রকৃতি, কৃষি, যোগাযোগ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। 

চিলমারী উপজেলার জনসংখ্যার উপাত্ত

• বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার মোট জনসংখ্যা ১,৩১,৭১৫ জন। এর মধ্যে ৬৫,২৪৩ জন পুরুষ এবং ৬৬,৪৬৮ জন নারী

প্রশাসন সংক্রান্ত তথ্য

চিলমারী উপজেলা কুড়িগ্রাম জেলার একটি প্রশাসনিক উপজেলা। ১৮৫০ সালে চিলমারী থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে থানাটিকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। এর প্রশাসনিক কাঠামো উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। চিলমারীতে ৬টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে; কোনো পৌরসভা নেই। উপজেলা প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপজেলার কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া চিলমারীতে কৃষি, শিক্ষা, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য, নির্বাচন, আনসার-ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর রয়েছে।

সংসদীয় এলাকার তথ্য

চিলমারী উপজেলা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কুড়িগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। এই আসনে চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুর উপজেলা রয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা:

চিলমারী উপজেলায় মোট ৬ টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ।

  1. অষ্টমির চর ইউনিয়ন
  2. নয়ারহাট ইউনিয়ন
  3. চিলমারী ইউনিয়ন
  4. রমনা ইউনিয়ন
  5. থানাহাট ইউনিয়ন
  6. রাণীগঞ্জ ইউনিয়ন

গ্রামের ও মৌজা সংখ্যা:

চিলমারী উপজেলায় মোট ১৫৮ টি গ্রাম রয়েছে এবং এই উপজেলায় ৫৮ টি মৌজা রয়েছে। 

শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য

জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী চিলমারীর সাক্ষরতার হার ৬৬.৩৮% (পুরুষ ৬৯.০৩%, নারী ৬৩.৮১%); ২০১১ সালে ছিল ৩৯.৬৭%। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব:

  • কলেজ: চিলমারী উপজেলায় মোট চারটি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি, যেটি চিলমারী সরকারি ডিগ্রি কলেজ নামে পরিচিত। 
  • উচ্চ বিদ্যালয়: সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই উপজেলায় মোট তেরোটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। 
  • মাদ্রাসা: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চিলমারী উপজেলায় মাদ্রাসার সংখ্যা বারোটি। তবে, এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। 
  • সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা পঞ্চান্নটি। 
  • বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: এই উপজেলায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে পয়ত্রিশটি।

অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য

চিলমারী উপজেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীবিধৌত এই অঞ্চলের কৃষি, চরাঞ্চলের উৎপাদন, হাট-বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ঐতিহ্যবাহী নদীবন্দর স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী চিলমারীতে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১৫,০০৩ একর। প্রধান অর্থকরী ও কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, গম, আলু, পাট ও বাদাম ও ভুট্টা।  এই উপজেলার মানুষের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষি—প্রায় ৬৭.৮৫%। ব্যবসা ৯.৩৮%, চাকরি ৬.৮১%, অকৃষি শ্রম ৫.১৭%, পরিবহন ও যোগাযোগ ১.২৩% এবং নির্মাণ খাত ১.০১%। স্থানীয় কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার জন্য থানাহাট বাজার, জোড়গাছ বাজার, বালাবাড়ীহাট বাজার, রমনা বাজার ও ফকিরেরহাট বাজারসহ বিভিন্ন হাট-বাজার রয়েছে। এলাকা ভেদে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন, যেমন রবিবার এবং বুধবার অথবা সোমবার এবং বৃহস্পতিবার, এসব জায়গায় হাট বসে। এই হাটে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামগ্রী, যেমন ধান, পাট, গম, ভুট্টা সহ বিভিন্ন শস্য কেনা ও বেচা হয়।

 

শিল্প

চিলমারীর অর্থনৈতিক ইতিহাসে নদীবন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একসময় এটি উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। উপজেলা সমবায় অফিসের ২০২৫ সালে হালনাগাদ করা তথ্যে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কার্যক্রম সীমিত থাকার পর বন্দরটি আবার চালু হয়েছে, যা  বর্তমানে চিলমারী নদীবন্দর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (BIWTA) প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় রয়েছে।

চিলমারী উপজেলার দর্শনীয় স্থান সমূহের তালিকা

চিলমারী উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু পর্যটন ও সাংস্কৃতিক স্থান, যা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।

রমনা ঘাট / চিলমারী নদী বন্দর

Fery in Chilmari

এটি রমনা ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্র নদ চিলমারীর অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক আকর্ষণ। নদী, চর এবং বিস্তৃত জলরাশি এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল অংশ। এখানকার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এর অবস্থান কুড়িগ্রাম জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। 

উষারাণীর বাড়ি (রাণীগন্জ)

উষারাণীর বাড়ি

চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত উষারাণীর বাড়িটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাণী উষারাণী। এটি রাণীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান।

রাজারঘাট (রাণীগন্জ)

রাজারঘাট

চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত রাজারঘাটটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। এই ঘাটটি তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি রাণীগঞ্জের একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান।

তিস্তা নদী

তিস্তা নদী

চিলমারী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তিস্তা নদী। এই নদীর তীরে অবস্থিত বাহারের ঘাট, মাটি কাটার মোড়, ভক্তিভিটের ঘাট, রাজারঘাট ইত্যাদি স্থান থেকে তিস্তা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।  

বাহারের ঘাট

Baharer Ghat

বাহারের ঘাট চিলমারী উপজেলার একটি পরিচিত দর্শনীয় স্থান। এটি নদীতীরবর্তী এলাকা; এখান থেকে নদী ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এখানকার বাহারের ঘাট ব্রিজও স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিত। ব্রিজ ও নদীকেন্দ্রিক পরিবেশের কারণে বিশেষ করে বিকেলের দিকে জায়গাটি ঘোরাঘুরি ও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য মানুষের কাছে আকর্ষণীয়।

আকালুর ঘাট

চিলমারী উপজেলা – Akalur Ghat

আকালুর ঘাট কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার একটি পরিচিত দর্শনীয় ও বিনোদনমূলক স্থান। স্থানটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো আকালুর ঘাট ব্রিজ। স্থানীয় যোগাযোগের পাশাপাশি এটি ঘোরাঘুরি ও অবসর কাটানোর জায়গা হিসেবেও পরিচিত। আকালুর ঘাট এলাকার সঙ্গে পাত্রখাতা, মিনাবাজার, মণ্ডলেরহাট, কাশিমবাজার, বজরাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ রয়েছে। আকালুর ঘাটের মূল আকর্ষণ এর খোলামেলা গ্রামীণ ও জলাভূমিনির্ভর পরিবেশ। সেতু, পানি, আশপাশের কৃষিজমি ও গ্রামীণ প্রকৃতি মিলিয়ে জায়গাটি বিশেষ করে বিকেলের দিকে ঘোরাঘুরি ও ছবি তোলার জন্য আকর্ষণীয়।

চিলমারী - হরিপুর তিস্তা সেতু

Horipur Bridge

চিলমারী–হরিপুর তিস্তা সেতু কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেতুটি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর এলাকা এবং কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার দিককে তিস্তা নদীর ওপর দিয়ে যুক্ত করেছে। চিলমারী–হরিপুর তিস্তা সেতু যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হওয়ার পাশাপাশি নতুন একটি দর্শনীয় ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সেতুর হরিপুর প্রান্তে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেতু ও তিস্তা নদীর সৌন্দর্য দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের কাছে চিলমারী–হরিপুর তিস্তা ব্রিজ আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো তিস্তা নদীর বিস্তৃত দৃশ্য ও খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেতুর ওপর ও আশপাশ থেকে নদী, চর এবং দুই তীরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। বিশেষ করে বিকেল ও গোধূলির সময় নদী ও সেতুর পরিবেশ ছবি তোলা ও পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিস্তারিত: চিলমারী-হরিপুর তিস্তা সেতু।