Ulipur Upazila
উলিপুর উপজেলা কুড়িগ্রামের অন্যতম একটি প্রশাসনিক এলাকা । এটি দেশের বৃহৎ উপজেলা সমূহের মধ্যে একটি। উলিপুর উপজেলা ঐতিহাসিক গুরুত্ব, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সমন্বয়ে গঠিত।


উলিপুর উপজেলা পরিচিতি
উলিপুর উপজেলার ইতিহাস, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এটি সমৃদ্ধ। উলিপুর উপজেলা রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল উপজেলা। নদ-নদী, চরাঞ্চল, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, প্রাচীন স্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস—সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে উলিপুরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

অবস্থান ও আয়তন
কুড়িগ্রাম জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে উলিপুর উপজেলার অবস্থান। এ উপজেলার উত্তরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ও রাজারহাট উপজেলা, দক্ষিণে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ও চিলমারী উপজেলা, পূর্বে রৌমারী উপজেলা ও ভারতের আসাম, পশ্চিমে রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলা ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা।
উলিপুর উপজেলার আয়তন ৪৫৮.৪৮ বর্গ কিলোমিটার — আয়তনে কুড়িগ্রামের সবচেয়ে বড় উপজেলা।
জনসংখ্যার উপাত্ত
জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী উলিপুরের জনসংখ্যা ৪,৪০,১৫২ জন, খানা ১,২০,৭৯৩টি। ২০১১ সালে ছিল ৩,৯৫,২০৭ জন।
প্রশাসন সংক্রান্ত তথ্য
উলিপুর উপজেলায় রয়েছে একটি পৌরসভা, ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ১৪৭টি মৌজা এবং ৩৫৮টি গ্রাম। এ উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম উলিপুর থানাধীন।
সংসদীয় এলাকার সংখ্যা:
উলিপুর উপজেলার ১টি এলাকা রয়েছে । নাম ও এলাকা: কুড়িগ্রাম– ৩ (উলিপুর)
পৌরসভার সংখ্যা:
উলিপুর উপজেলায় ১টি মাত্র পৌরসভা রয়েছে । সেটি হলো উলিপুর পৌরসভা ।
ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা:
মোট ১৩ টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ।
- দূর্গাপুর
- বেগমগঞ্জ
- বুড়াবুড়ি
- বজরা
- দলদলিয়া
- ধামশ্রেণী
- ধড়নিবাড়ি
- গুনাইগাছ ইউনিয়ন
- হাতিয়া
- পান্ডুল
- সাহেবের আলগা
- তবকপুর
- থেতরাই
গ্রামের সংখ্যা:
উলিপুর উপজেলায় মোট ৩৫৮টি গ্রাম রয়েছে
মুক্তিযুদ্ধে উলিপুর
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে উলিপুরের ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৩ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী হাতিয়া এলাকায় প্রায় ৭০০ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। এছাড়া মঙ্গলের হাট এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। উপজেলায় হাতিয়া দাগারকুটি, ধরণীবাড়ীর মধুপুর এবং উলিপুর ডাকবাংলোর নিকটবর্তী এলাকায় গণকবরের উল্লেখ রয়েছে। এসব স্থান মুক্তিযুদ্ধের সময় উলিপুরের মানুষের আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে
শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য
জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী উলিপুরের সাক্ষরতার হার ৬৪.৭০% (পুরুষ ৬৮.২০%, মহিলা ৬১.৩৯%); ২০১১ সালে ছিল ৪৫.৬৪%। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে এ উপজেলায় ৮টি কলেজ (১টি সরকারি কলেজ), ৬২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়), ২৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), ৫৫টি মাদ্রাসা (৪০টি দাখিল, ৬টি আলিম, ৮টি ফাজিল ও ১টি কামিল মাদ্রাসা) রয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
কলেজ
- উলিপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ (১৯৬৪)
- উলিপুর মহিলা মহাবিদ্যালয় (১৯৮৬)
- পাঁচপীর ডিগ্রি কলেজ (১৯৮৭)
- মন্ডলেরহাট মহাবিদ্যালয় (২০০০)
- এমএ মতিন কারিগরী ও কৃষি কলেজ (১৯৯৫)
- উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ (১৯৯৯)
মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৬৮)
- বুড়াবুড়ী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭)
- মন্ডলহাট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৫)
- দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৪)
- বকশিগঞ্জ রাজিবিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪৫)
- উলিপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (১৯০৯
প্রাথমিক বিদ্যালয়
- উলিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯০৯)
- বুড়াবুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৮৮৯)
- যমুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯৩৭)
- দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯১৪
মাদ্রাসা
- সাতদরগা নেছারিয়া আলীয়া মাদ্রাসা (১৯৫২)
- কামাল খামার দ্বিমুখী সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৫৪)
- নুরেশ্বর আমীনিয়া মাদ্রাসা (১৯৫৪
অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য
উলিপুরের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। তাছাড়া ওখানে ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এখানকার লোকজনের প্রাধান পেশা হচ্ছে কৃষি কাজ। তাছাড়াও আছে চাকরিজীবী,কামার,কুমার,জেলে ইত্যাদি।
কৃষি
- মোট আবাদী জমির পরিমাণঃ ২৮,২৫০ একর
- অর্থকরী ফসলঃ ধান, গম, সবজি,আলু, পাঠ, আখ প্রভৃত
শিল্প
- শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাঃ মোট ৭৩০টি, কুটির শিল্প- ৭৩০টি
যোগাযোগ ব্যবস্থা
- পাকা রাস্তাঃ ১৮০কি. মি
- কাঁচা রাস্তাঃ ৪৪৬ কি. মি
দর্শনীয় স্থান সমূহের তালিকা
উলিপুর উপজেলা তার ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য পর্যটন ও সাংস্কৃতিক স্থান, যা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।
টুপামারী বিল

উলিপুর উপজেলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান হল টুপামারী বিল। এই বিলটি তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। বিলের চারপাশে সবুজ মাঠ, খেজুরের বাগান ও বিশাল জলাভূমি রয়েছে। বিলে নানা প্রজাতির পাখি ও জলচর প্রাণী বাস করে।
জালার পীরের দরগাহ

উলিপুর উপজেলার জালা গ্রামে অবস্থিত জালার পীরের দরগাহটি একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান। এই দরগাহটি ৭০০-৮০০ বছরের পুরনো বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি পবিত্র স্থান, বছরজুড়ে দর্শনার্থীরা আসেন।
উলিপুর মুন্সিবাড়ী

উলিপুর মুন্সিবাড়ীর অবস্থান উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ি ইউনিয়নে। ৩৯ একর জায়গার ওপর এর বিশাল অট্টলিকা গুলো কালের সাক্ষি হয়ে দাড়িয়ে আছে। উলিপুর বাজার থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।
কাজীর মসজিদ

উলিপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কাজীর মসজিদটি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। স্থানীয় তথ্যমতে এটি মোগল আমলের (আনুমানিক ১৭শ শতক) স্থাপনা, পুরনো স্থাপত্যশৈলীর জন্য পরিচিত।
ব্রহ্মপুত্র নদ

উলিপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। চর, খেয়াঘাট আর বিকেলের সূর্যাস্ত দেখতে অনেকে নদের পাড়ে যান। বর্ষায় এই নদই আবার ভাঙনের বড় কারণ।
তিস্তা নদী

উলিপুর উপজেলার সীমান্ত দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। তিস্তার চরে শুকনো মৌসুমে ভুট্টা, মরিচ আর বাদামের চাষ চোখে পড়ার মতো।
সব মিলিয়ে, উলিপুর উপজেলা কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস, শিক্ষা, কৃষি, সংস্কৃতি ও নদীমাতৃক প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার প্রভাব যেমন এখানকার কৃষি ও জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি বন্যা ও নদীভাঙন স্থানীয় মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। উলিপুর মুন্সিবাড়ীর মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির এবং হাতিয়া দাগারকুটির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি উপজেলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
এক নজরে উলিপুর উপজেলা
| আয়তন | ৪৫৮.৪৮ বর্গ কিমি |
| জনসংখ্যা | ৪,৪০,১৫২ জন (জনশুমারি ২০২২) |
| ইউনিয়ন / পৌরসভা | ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা (উলিপুর পৌরসভা) |
| প্রধান নদ-নদী | তিস্তা (পশ্চিমে), ব্রহ্মপুত্র (পূর্বে), ধরলা (উত্তর-পূর্বে) |
| শিক্ষার হার | ৬৪.৭০% (২০২২) |
| বিশেষত্ব | আয়তনে কুড়িগ্রামের বৃহত্তম উপজেলা; ক্ষীরমোহনের জন্য বিখ্যাত |
| জেলা ও বিভাগ | কুড়িগ্রাম জেলা, রংপুর বিভাগ |
কুড়িগ্রাম শহর থেকে উলিপুর: কীভাবে যাবেন
কুড়িগ্রাম শহর থেকে উলিপুর উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২০–২২ কিমি; কুড়িগ্রাম–চিলমারী সড়কে বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় ৩০–৪০ মিনিট। উলিপুর রেলস্টেশন হয়ে ট্রেনেও (কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস/লোকাল) যাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসার বাস ও ট্রেনের বিস্তারিত দেখুন: কুড়িগ্রামের যাতায়াত গাইড এবং ঢাকা টু কুড়িগ্রাম বাস ভাড়া ও সময়সূচী।
উলিপুর উপজেলার সরকারি অফিস ও জরুরি যোগাযোগ
- উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) কার্যালয়, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা ভূমি অফিস — কর্মকর্তাদের নাম ও ফোন নম্বর উলিপুর উপজেলা তথ্য বাতায়নে পাওয়া যায়।
- উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উলিপুর থানা — জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯।
- কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের নাম্বার: জরুরি সেবার নাম্বার।
- জেলা ও উপজেলার সব সরকারি ওয়েবসাইট: কুড়িগ্রামের সরকারি ওয়েবসাইটের তালিকা।
উলিপুর উপজেলা কীসের জন্য বিখ্যাত?
সবচেয়ে বেশি পরিচিত উলিপুরের ক্ষীরমোহন। এছাড়া মুন্সিবাড়ি, টুপামারী (জিয়া) পুকুর, জালার পীরের দরগাহ ও সাতদরগাহ মাজার।
উলিপুর সম্পর্কিত লিস্টিং ও গাইড (Kurigram.info)
- উলিপুরের ক্ষীরমোহন: ইতিহাস, দাম ও কোথায় পাবেন
- উলিপুর মুন্সিবাড়ি
- টুপামারী পুকুর (জিয়া পুকুর)
- মরিয়ম চক্ষু হাসপাতাল, উলিপুর
- উলিপুরের সব লিস্টিং
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
উলিপুর উপজেলায় কয়টি ইউনিয়ন?
উলিপুর উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ১টি পৌরসভা রয়েছে।
উলিপুর উপজেলার আয়তন ও জনসংখ্যা কত?
আয়তন ৪৫৮.৪৮ বর্গ কিমি; জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী জনসংখ্যা ৪,৪০,১৫২ জন। আয়তনে এটি কুড়িগ্রামের বৃহত্তম উপজেলা।
কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর কত কিলোমিটার?
কুড়িগ্রাম শহর থেকে উলিপুর উপজেলা সদর প্রায় ২০–২২ কিলোমিটার; সড়কপথে ৩০–৪০ মিনিট লাগে।
উলিপুর কীসের জন্য বিখ্যাত?
উলিপুর সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ক্ষীরমোহনের জন্য; এছাড়া মুন্সিবাড়ি ও টুপামারী পুকুর উল্লেখযোগ্য।
তথ্যসূত্র
- উলিপুর উপজেলা তথ্য বাতায়ন (সরকারি পোর্টাল)
- উলিপুর উপজেলা — বাংলাপিডিয়া
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো — জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২
তথ্য হালনাগাদ: সেপ্টেম্বর ২০২৬। আদমশুমারির সংখ্যা উৎসভেদে ভিন্ন হতে পারে।