খাজনা ক্যালকুলেটর — ভূমি উন্নয়ন কর কত টাকা আসবে
খাজনা, মানে ভূমি উন্নয়ন কর, বছরে একবার দিতে হয়। বেশিরভাগ কৃষকের ক্ষেত্রে অঙ্কটা অবাক করার মতো কম — বছরে মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু হার নিয়ে এত গুজব ছড়ানো যে অনেকে না জেনে কয়েকগুণ বেশি দিয়ে ফেলেন।
নিচের ক্যালকুলেটরে জমির পরিমাণ বসিয়ে দেখে নিন আপনার ঠিক কত আসবে। কৃষি আর অকৃষি — দুই ধরনের জমিরই হিসাব হবে, বকেয়া বছর থাকলে সেটাও ধরা যাবে।
২ টাকা আর ১০ টাকা — পার্থক্যটা কোথায়
এই দুটো সংখ্যা নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়। এগুলো কর-এর দুটো ধাপ নয়, সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জিনিস:
- ১০ টাকা হলো রসিদ ফি। আপনার জমি করমুক্ত হলেও বছরে এই ১০ টাকা দিয়ে দাখিলা নিতে হয়।
- প্রতি শতাংশে ২ টাকা হলো আসল করের হার — শুধু করযোগ্য কৃষি জমির ক্ষেত্রে।
কুড়িগ্রামের বেশিরভাগ পরিবারের জমি ৮.২৫ একরের নিচে, তাই তাদের কর নেই — শুধু ওই ১০ টাকা।
কত জমি পর্যন্ত খাজনা মাফ
একজন ব্যক্তি বা এক পরিবারের নামে ৮.২৫ একর (২৫ বিঘা, অর্থাৎ ৮২৫ শতাংশ) পর্যন্ত কৃষি জমি ভূমি উন্নয়ন কর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এটি ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩(২)-এ বলা আছে।
তবে একটা কথা ভালো করে বুঝে নিন — সীমা পেরোলে কর বসে পুরো জমির উপর, শুধু অতিরিক্ত অংশের উপর নয়। ৯ একর জমি থাকলে ০.৭৫ একরের কর নয়, পুরো ৯ একরেরই কর দিতে হবে। অনেক ওয়েবসাইট এখানে ভুল হিসাব দেখায়।
চা, কফি, রাবার বা ফল-ফুলের বাগান, বাণিজ্যিক মাছ ও চিংড়ির খামার, পোলট্রি বা গবাদিপশুর খামার — এবং যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা জমি — এগুলোর ক্ষেত্রে পরিমাণ যাই হোক, অব্যাহতি নেই।
অকৃষি জমির হার কীভাবে ঠিক হয়
অকৃষি জমিতে দুটো জিনিসের উপর হার নির্ভর করে: এলাকা আর ব্যবহার। আইনে তিনটি শ্রেণি — বাণিজ্যিক, শিল্প, আর আবাসিক ও অন্যান্য (ধারা ৪)। আর এলাকাকে ভাগ করা হয়েছে ছয় ভাগে, “ক” থেকে “চ” পর্যন্ত।
কুড়িগ্রামের হিসাবটা দাঁড়ায় এরকম:
- কুড়িগ্রাম পৌরসভা জেলা সদর পৌরসভা হিসেবে “গ” শ্রেণিতে পড়ে — আবাসিক জমিতে প্রতি শতাংশে বছরে ৪০ টাকা, বাণিজ্যিক ২০০ টাকা।
- উপজেলার গ্রামাঞ্চল, অর্থাৎ পৌরসভার বাইরের এলাকা, “চ” শ্রেণি — আবাসিক মাত্র ১০ টাকা, বাণিজ্যিক ৪০ টাকা।
আরেকটা খুঁটিনাটি অনেকে জানেন না: অকৃষি জমিতে ভগ্নাংশ শতাংশ উপরের দিকে পূর্ণ ধরা হয়। ৫.৩ শতাংশ জমি মানে ৬ শতাংশের কর।
এই হারগুলো আইনে নয়, সরকারি প্রজ্ঞাপনে ঠিক করা — তাই সরকার চাইলে প্রজ্ঞাপন দিয়েই বদলাতে পারে। বর্তমান হার ২০১৫ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী।
বকেয়া পড়লে কী হয়
এই অংশটা অনেকেই জানেন না, অথচ সবচেয়ে জরুরি।
প্রতি অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে কর না দিলে সেটি বকেয়া হয়ে যায় (ধারা ৯(১))। বকেয়া টাকার উপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ জরিমানা যোগ হয় (ধারা ৯(২))। আর টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে আপনার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে।
১০ টাকার জিনিস ফেলে রাখলে কয়েক বছরে জরিমানাসহ বড় ঝামেলায় দাঁড়ায় — আর তার চেয়ে বড় ক্ষতি হলো, নামজারি বা জমি বিক্রির সময় বকেয়া থাকলে কাজ আটকে যায়।
অনলাইনে খাজনা দেবেন যেভাবে
এখন আর ভূমি অফিসে লাইন ধরার দরকার নেই। ldtax.gov.bd থেকে ঘরে বসেই দেওয়া যায়:
- NID, জন্মতারিখ আর মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করুন
- নাগরিক কর্নারে গিয়ে হোল্ডিং খুঁজুন — বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা ও হোল্ডিং নম্বর দিয়ে
- হোল্ডিং না থাকলে খতিয়ানের কাগজ দিয়ে নতুন হোল্ডিং তৈরির আবেদন করুন
- অনলাইন পেমেন্টে গিয়ে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় বা কার্ডে টাকা দিন
- OTP দিয়ে নিশ্চিত করার পর অনলাইন দাখিলা ডাউনলোড করে নিন
হোল্ডিং তৈরি হতে সাধারণত ৭ থেকে ৩০ দিন লাগে, তাই ৩০ জুনের আগে হাতে সময় রেখে শুরু করুন। প্রয়োজনে ১৬১২২ বা ৩৩৩ নম্বরে সাহায্য চাইতে পারেন।
দাখিলা কেন যত্ন করে রাখবেন
দাখিলা শুধু টাকা দেওয়ার রসিদ নয়। ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৪ অনুযায়ী এটি প্রতিটি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে দেওয়া হয়, আর বাস্তবে এটিই আপনার অব্যাহত ভোগদখলের প্রমাণ।
জমি নিয়ে বিরোধ বাধলে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ নিয়ে কথা উঠলে, বা কেউ দখলের দাবি করলে — ধারাবাহিক দাখিলাই আদালতে আপনার সবচেয়ে শক্ত কাগজ। অনলাইনের দাখিলা কাগজের দাখিলার মতোই বৈধ, তবে PDF নামিয়ে সংরক্ষণ করে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাবার নামে থাকা জমির খাজনা আমি দিতে পারব?
পারবেন। হোল্ডিং নম্বর জানা থাকলে যে কেউ টাকা দিতে পারে — দাখিলা হোল্ডিংয়ের মালিকের নামেই আসবে। তবে বাবা মারা গিয়ে থাকলে আগে ওয়ারিশসূত্রে নামজারি করিয়ে নেওয়াই ভালো।
হোল্ডিং নম্বর জানি না, কী করব?
ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর বললে হোল্ডিং বের করে দেবে। অথবা ldtax.gov.bd-এ মৌজা ও খতিয়ান দিয়ে খুঁজে দেখুন।
দাখিলায় নাম বা পরিমাণ ভুল এলে?
সাথে সাথে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জানান। টাকা দেওয়ার পর সংশোধন সম্ভব, তবে দেরি করলে পরের বছরের হিসাবেও ভুলটা চলে আসবে।
প্রবাস থেকে খাজনা দেওয়া যায়?
যায়। ldtax.gov.bd বিদেশ থেকেও চলে, আর কার্ডে টাকা দেওয়া যায়। দেশের কারও মোবাইল ব্যাংকিং দিয়েও দেওয়া যায়।
খাজনা আর ভূমি উন্নয়ন কর কি আলাদা?
না, একই জিনিস। “খাজনা” মুখের কথা, সরকারি কাগজে লেখা হয় “ভূমি উন্নয়ন কর”।