Rajarhat Upazila
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান, যা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।



রাজারহাট উপজেলা পরিচিতি
রাজারহাট উপজেলা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, তিস্তা ও ধরলা নদী, প্রাচীন জমিদারবাড়ি, মসজিদ-মন্দির এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের কারণে রাজারহাটের স্বতন্ত্র পরিচিতি রয়েছে।

অবস্থান ও আয়তন
এই উপজেলাটি জেলা সদর থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এ উপজেলার উত্তরে ফুলবাড়ী উপজেলা ও লালমনিরহাট সদর উপজেলা, দক্ষিণে উলিপুর উপজেলা ও রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলা, পূর্বে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা, পশ্চিমে লালমনিরহাট সদর উপজেলা ও রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলা।
এই উপজেলার মোট আয়তন ১৬৬.৬৪ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যার উপাত্ত
- জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী জনসংখ্যা ২,০৩,০৬০ জন, খানা ৫৩,৬২৫টি। ২০১১ সালে ছিল ১,৮২,৯৮১ জন।
প্রশাসন সংক্রান্ত তথ্য
সংসদীয় এলাকার সংখ্যা:
রাজারহাট উপজেলায় ১টি এলাকা রয়েছে । নাম ও এলাকা: কুড়িগ্রাম-২ ( রাজারহাট, কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী)
পৌরসভার সংখ্যা:
রাজারহাট উপজেলায় কোন পৌরসভা নেই।
ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা:
মোট ৭ টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ।
- ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন
- ছিনাই ইউনিয়ন
- রাজারহাট ইউনিয়ন
- চাকিরপশার ইউনিয়ন
- বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন
- উমরমজিদ ইউনিয়ন
- নজিমখাঁন ইউনিয়ন
গ্রামের সংখ্যা:
রাজারহাট উপজেলায় মোট ১৮০টি গ্রাম রয়েছে
শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য
এখানে রয়েছে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নানা প্রতিষ্ঠান, যা গড়ে তুলছে জ্ঞানপিপাসু নতুন প্রজন্ম।
- সাক্ষরতার হার: ৭০.২৭% (জনশুমারি ২০২২) — জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ; ২০১১ সালে ৫২.০৩%
- কলেজ: ১৪টি ।
- উচ্চবিদ্যালয়: ৩২টি ।
- মাদ্রাসা: ২৩টি ।
- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:
- ৪৯টি ।
- বেসরকারি প্রাথমিক
- বিদ্যালয়: ৬৭টি ।
অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য
রাজারহাট উপজেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। তাছাড়া ওখানে ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কৃষি
- মোট আবাদী জমি: ৩০১০৯.৩০ একর
- অর্থকরী ফসল: ধান, গম, আলু, পাট, তামাক, সরিষা, সুপারি, বাঁশ, আখ, ভুট্টা প্রভৃতি।
যোগাযোগ ব্যবস্থা
- পাকা রাস্তা: ১৫৯.৩২ কি. মি
- কাঁচা রাস্তা: ২৯৮.৩৪ কি. মি.
দর্শনীয় স্থান সমূহের তালিকা
রাজারহাট উপজেলা তার ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য পর্যটন ও সাংস্কৃতিক স্থান, যা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।
ঠাঁটমারি বধ্যভূমি

রাজারহাট উপজেলার ঠাঁটমারি গ্রামে অবস্থিত ঠাঁটমারি বধ্যভূমিটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। এই বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।
অচিন গাছ

টগরাইহাটের অচিন গাছ রাজারহাটের সবচেয়ে রহস্যময় দর্শনীয় স্থান। গাছটির প্রজাতি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না, তাই নাম “অচিন”। স্থানীয় প্রবীণদের মতে এর বয়স কয়েকশো বছর।
পাঙ্গা জমিদার বাড়ি

পাঙ্গা জমিদার বাড়ি ছিনাই ইউনিয়নে, জেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিমি উত্তর-পশ্চিমে। পাঙ্গা রানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে এখন টিকে আছে ভাঙা ইটের স্তূপ, একটি শান-বাঁধানো পুকুর আর প্রায় অক্ষত কাচারিঘর।
চান্দামারী মসজিদ

চান্দামারী মসজিদ মোগল আমলের স্থাপনা, স্থানীয় হিসাবে প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। তিন গম্বুজ আর দেয়ালের পুরনো কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে।
মেকুরটারী মসজিদ

মেকুরটারী গ্রামের এই পুরনো মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।
ব্যাপারী পাড়া শাহী মসজিদ

ব্যাপারী পাড়ার শাহী মসজিদও উপজেলার পুরনো মসজিদগুলোর একটি; জুমার দিনে আশপাশের গ্রাম থেকে মুসল্লিরা আসেন।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা বিল

ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বড় বিল। শীতে এখানে অতিথি পাখি আসে, আর বিলের মাছ স্থানীয় বাজারে বেশ জনপ্রিয়।
কোটেশ্বর শিব মন্দির

কোটেশ্বর গ্রামের পুরনো শিব মন্দির; শিবরাত্রিতে এখানে মেলা বসে।
চতুর্ভুজ শিব মন্দির

চতুর্ভুজ গ্রামের এই শিব মন্দিরও উপজেলার পরিচিত ধর্মীয় স্থাপনা।
সিন্দুরমতি দিঘি

সিন্দুরমতি দিঘি উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়। এটি কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার সীমান্তবর্তী পঞ্চগ্রাম এলাকার সিন্দুরমতি মৌজায় অবস্থিত।দিঘিটির নামকরণ নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের বর্ণনা অনুযায়ী, সিংহল বা বর্তমান শ্রীলঙ্কা থেকে আগত রাজনারায়ণ চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তি সন্তান লাভের আশায় দিঘিটি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর দুই কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাঁদের নাম রাখা হয় সিন্দুর ও মতি।কথিত আছে, দিঘি খনন শেষ হওয়ার পরও সেখানে পানি উঠছিল না। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে নবমীর দিনে দিঘির মাঝখানে পূজার আয়োজন করা হয়। সেখানে সিন্দুর ও মতি উপস্থিত ছিল। পূজা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ পানি উঠে দিঘিটি ভরে যায় এবং দুই বোন পানিতে ডুবে মারা যায়। তাঁদের স্মরণে দিঘিটির নাম হয় “সিন্দুরমতি দিঘি” এবং কালক্রমে আশপাশের এলাকাও সিন্দুরমতি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এক নজরে রাজারহাট উপজেলা
| আয়তন | ১৬৬.৬৪ বর্গ কিমি |
| জনসংখ্যা | ২,০৩,০৬০ জন (জনশুমারি ২০২২) |
| ইউনিয়ন / পৌরসভা | ৭টি ইউনিয়ন (উলিপুর থানার ৪টি ও লালমনিরহাট থানার ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত) |
| প্রধান নদ-নদী | তিস্তা |
| ইতিহাস / প্রতিষ্ঠা | ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উপজেলা কার্যক্রম শুরু |
| জেলা ও বিভাগ | কুড়িগ্রাম জেলা, রংপুর বিভাগ |
কুড়িগ্রাম শহর থেকে রাজারহাট: কীভাবে যাবেন
কুড়িগ্রাম শহর থেকে রাজারহাট উপজেলা সদর মাত্র প্রায় ১২ কিমি; কুড়িগ্রাম–রংপুর মহাসড়ক ধরে বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় ২০–২৫ মিনিট। রংপুর থেকে আসার পথে কুড়িগ্রামের আগেই রাজারহাট পড়ে।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসার বাস ও ট্রেনের বিস্তারিত দেখুন: কুড়িগ্রামের যাতায়াত গাইড এবং ঢাকা টু কুড়িগ্রাম বাস ভাড়া ও সময়সূচী।
রাজারহাট উপজেলার সরকারি অফিস ও জরুরি যোগাযোগ
- উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) কার্যালয়, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা ভূমি অফিস — কর্মকর্তাদের নাম ও ফোন নম্বর রাজারহাট উপজেলা তথ্য বাতায়নে পাওয়া যায়।
- রাজারহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রাজারহাট থানা — জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯।
- কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের নাম্বার: জরুরি সেবার নাম্বার।
- জেলা ও উপজেলার সব সরকারি ওয়েবসাইট: কুড়িগ্রামের সরকারি ওয়েবসাইটের তালিকা।
রাজারহাট উপজেলা কীসের জন্য বিখ্যাত?
পাঙ্গা জমিদার বাড়ি, চান্দামারী মসজিদ, টগরাইহাটের অচিন গাছ, নাককাটি হাটের হাঁসের মাংস, ত্রিমোহনীর চটপটি।
রাজারহাট সম্পর্কিত লিস্টিং ও গাইড (Kurigram.info)
- পাঙ্গা জমিদার বাড়ি
- চান্দামারী মসজিদ
- টগরাইহাটের অচিন গাছ
- নাককাটি বাজারের হাঁসের মাংস
- রাজারহাটের সব লিস্টিং
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
রাজারহাট উপজেলায় কয়টি ইউনিয়ন?
রাজারহাট উপজেলায় ৭টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে।
রাজারহাট উপজেলা কবে গঠিত হয়?
১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাজারহাট উপজেলা হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
কুড়িগ্রাম থেকে রাজারহাট কত কিলোমিটার?
কুড়িগ্রাম শহর থেকে রাজারহাট উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার — জেলার সবচেয়ে কাছের উপজেলা সদর।
রাজারহাটের দর্শনীয় স্থান কী কী?
পাঙ্গা জমিদার বাড়ি, চান্দামারী মসজিদ ও টগরাইহাটের অচিন গাছ রাজারহাটের প্রধান দর্শনীয় স্থান।
তথ্যসূত্র
- রাজারহাট উপজেলা তথ্য বাতায়ন (সরকারি পোর্টাল)
- রাজারহাট উপজেলা — বাংলাপিডিয়া (জনসংখ্যা ২০১১)
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো — জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২
তথ্য হালনাগাদ: সেপ্টেম্বর ২০২৬। আদমশুমারির সংখ্যা উৎসভেদে ভিন্ন হতে পারে।