Char Rajibpur Upazila
চর রাজিবপুর বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার একটি উপজেলা। ব্রহ্মপুত্র ও অন্যান্য নদ-নদীঘেরা এই উপজেলা কুড়িগ্রাম জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা, কৃষি এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কারণে এলাকাটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১ আগস্ট ১৯৮৩ সালে ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে চর রাজিবপুর উপজেলার যাত্রা শুরু হয়।

চর রাজিবপুর উপজেলা পরিচিতি
চর রাজিবপুর উপজেলা বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা।স্থানীয় ভাবে এটি রাজিবপুর উপজেলা নামে পরিচিত।বাংলাদেশের নারী খেতাবপ্রাপ্ত বীরপ্রতীক তারামন বিবি এই উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন।বাংলাদেশের প্রথম সীমান্ত হাট বালিয়ামারী-কালাইরচর সীমান্ত হাট এই উপজেলায় অবস্থিত।ভৌগোলিক ভাবে এই উপজেলাটি জামালপুর সীমান্তে এবং কুড়িগ্রাম জেলার মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন।এই উপজেলায় ছোট বড় প্রায় ৩০ টি চর রয়েছে।

চর রাজিবপুর উপজেলার অবস্থান ও আয়তন
এর আয়তন ১১১.০৩২ বর্গ কিলোমিটার। এ উপজেলার উত্তরে রৌমারী উপজেলা ও চিলমারী উপজেলা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ, দক্ষিণে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ও গাইবান্ধা জেলার গাইবান্ধা সদর উপজেলা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ, পূর্বে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা।
জনসংখ্যার উপাত্ত
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী চর রাজিবপুর উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৭৮,৩৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৮,৩৭৮ জন, নারী ৪০,০০৪ জন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্য ১ জন।
প্রশাসন সংক্রান্ত তথ্য
সংসদীয় এলাকার সংখ্যা:
চর রাজিবপুরের ১টি সংসদীয় এলাকা রয়েছে । নাম ও এলাকা: ২৮, কুড়িগ্রাম-৪ (রৌমারী, রাজিবপুর এবং চিলমারী)
গ্রাম ও ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা:
রাজিবপুর উপজেলায় মোট ১০২টি গ্রাম রয়েছে এবং এখানে মোট ৩ টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ।
- রাজিবপুর,
- কোদালকাটি
- মোহনগঞ্জ
শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য
চর রাজিবপুরের সাক্ষরতার হার ৬১.৩৯% (পুরুষ ৬২.৮৭%, নারী ৫৯.৯৯%; জনশুমারি ২০২২)। এখানে ১ টি ডিগ্রি কলেজ, ১টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, ২টি কারিগরি কলেজ, ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬টি মাদ্রাসা, ২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৩৩টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে।
উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানসূমহ
কলেজ
- রাজিবপুর সরকারি কলেজ,
- রাজিবপুর মহিলা কলেজ,
টেকনিক্যাল কলেজ
- রাজিবপুর টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ,
- চর রাজিবপুর টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ
মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- রাজিবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়,
- রাজিবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,
- চরনেওয়াজী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়,
- কোদালকাটি সাদাকাত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়,
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
- রাজিবপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
- চর রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
- রাজিবপুর মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
- জাউনিয়ার চর মিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
- সরকার-পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
- মোহনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য
চর রাজিবপুরের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। তাছাড়া এখানে ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে ধান, পাট, গম, সরিষা, বিভিন্ন ধরনের ডাল/কলাই, চিনাবাদাম ও ভুট্টা উৎপাদিত হয়। নদী ও চরকেন্দ্রিক ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা নদী ও চরাঞ্চলের পরিবেশের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
কৃষি
- মোট আবাদী জমি: ১৫৪৫০ একর
- অর্থকরী ফসল: ধান, পাট, সরিষা,বাদাম, কাউন প্রভৃতি
- প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ধান, পাট, গুড়, বাদাম
শিল্প
- শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা: মোট ৭টি, কুটির শিল্প- ৭টি
- শিল্প ও কলকারখানা ওয়েল্ডিং ৫, চাল ও আটা মিল
- কুটিরশিল্প কুমার ২২, বাঁশ ও বেত শিল্প ৩০, স্বর্ণকার ১০, কাঠের কাজ ১২, সেলাই কাজ ২০
যোগাযোগ ব্যবস্থা
কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও চর রাজিবপুর জেলা সদরের মূল ভূখণ্ড থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। উপজেলা প্রশাসনের বর্ণনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলা সদর থেকে সেখানে যেতে সড়ক ও নদীপথ মিলিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তবে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ–শেরপুর–জামালপুর হয়ে সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ট্রেনে ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকেও সড়কপথে রাজিবপুর যাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
চর রাজিবপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কোদালকাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি যুদ্ধ হয় এবং ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এছাড়া শংকর মাধবপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বহু মানুষ নিহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে। চর রাজিবপুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো বীর প্রতীক তারামন বিবি। উপজেলা প্রশাসন তাঁর বাসভবনকে এলাকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধা
চর রাজিবপুরে ১টি সরকারি হাসপাতাল ও ১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও গ্রামীণ ব্যাংকের উপস্থিতি রয়েছে।এবং ৩টি ডাকঘর রয়েছে।
দর্শনীয় স্থান সমূহের তালিকা
চর রাজিবপুরের অন্যতম আকর্ষণ এর নদী ও চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিশেষভাবে জিঞ্জিরাম নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বীর প্রতীক তারামন বিবির বাসভবন চর রাজিবপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এই উপজেলার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ নদী। আর এই নদীগুলোর কোল ঘেষা গ্রামগুলো দেখতে অনেক সুন্দর। আরও রয়েছে ছোট বড় অনেক চর যা দেখলে মনে হয় এক একটা দ্বীপ। আর এই চরগুলোর সৌন্দর্য কাশফুল আরও বহুগুন বাড়িয়ে দেয়।
বালিয়ামারী-কালাইরচর সীমান্ত হাটঃ

বালিয়ামারী-কালাইরচর সীমান্ত হাট হলো প্রথম বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সীমান্ত হাট যেটা ২০১১ সালে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগীয় জেলার কুড়িগ্রামের উপজেলা রাজিবপুরের বালিয়ামারি সীমান্তে ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কালাইচর সীমান্তের জিরো পয়েন্টে চালু হয়। যেটা এখনো চালু রয়েছে এবং এলাকার অর্থনিতী তে ভুমিকা রেখে চলেছে।
জিঞ্জিরাম নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্যঃ

চর রাজীবপুরের অন্যতম আকর্ষণ জিঞ্জিরাম নদী ও এর আশপাশের চরাঞ্চল। নদীর তীর, বিস্তৃত চর, গ্রামীণ জনপদ এবং উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ এই এলাকার সৌন্দর্যের প্রধান উপাদান। রাজীবপুর ইউনিয়নের পূর্ব দিকে জিঞ্জিরাম নদী অবস্থিত।
বীর প্রতীক তারামন বিবির বাসভবনঃ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য এটি চর রাজীবপুরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি। তারামন বিবি বীর প্রতীক বাংলাদেশের দুইজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধার একজন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তাঁর বাসভবনকে চর রাজীবপুর উপজেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শনীয় স্থানের তালিকায় রেখেছে।
এক নজরে চর রাজিবপুর উপজেলা
| আয়তন | ১১১.০৩ বর্গ কিমি (জেলার ক্ষুদ্রতম উপজেলা) |
| জনসংখ্যা | ৭৮,৩৮৩ জন (জনশুমারি ২০২২) |
| ইউনিয়ন / পৌরসভা | ৩টি ইউনিয়ন |
| গ্রাম | ১০২টি |
| প্রধান নদ-নদী | ব্রহ্মপুত্র, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম |
| শিক্ষার হার | ৬১.৩৯% (২০২২) |
| ইতিহাস / প্রতিষ্ঠা | ১৯৭৭ সালে থানা গঠিত; ১৯৭১ সালে কোদালকাটির যুদ্ধে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ |
| জেলা ও বিভাগ | কুড়িগ্রাম জেলা, রংপুর বিভাগ |
কুড়িগ্রাম শহর থেকে চর রাজিবপুর: কীভাবে যাবেন
চর রাজিবপুর ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পাড়ে; কুড়িগ্রাম শহর থেকে চিলমারী নৌঘাট হয়ে নৌপথে রাজিবপুর ঘাট, অথবা সড়কপথে জামালপুর–বকশীগঞ্জ–রৌমারী হয়ে। ঢাকা থেকে রৌমারীগামী বাসে এসে সেখান থেকে অটোরিকশায় রাজিবপুর।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসার বাস ও ট্রেনের বিস্তারিত দেখুন: কুড়িগ্রামের যাতায়াত গাইড এবং ঢাকা টু কুড়িগ্রাম বাস ভাড়া ও সময়সূচী।
চর রাজিবপুর উপজেলার সরকারি অফিস ও জরুরি যোগাযোগ
- উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) কার্যালয়, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা ভূমি অফিস — কর্মকর্তাদের নাম ও ফোন নম্বর চর রাজিবপুর উপজেলা তথ্য বাতায়নে পাওয়া যায়।
- চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চর রাজিবপুর থানা — জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯।
- কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের নাম্বার: জরুরি সেবার নাম্বার।
- জেলা ও উপজেলার সব সরকারি ওয়েবসাইট: কুড়িগ্রামের সরকারি ওয়েবসাইটের তালিকা।
চর রাজিবপুর উপজেলা কীসের জন্য বিখ্যাত?
দেশের প্রথম বর্ডার হাট (বালিয়ামারী-কালাইরচর, ২০১১), জিঞ্জিরাম নদীর চর আর বীর প্রতীক তারামন বিবির জন্মস্থান হিসেবে।
চর রাজিবপুর সম্পর্কিত লিস্টিং ও গাইড (Kurigram.info)
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
চর রাজিবপুর উপজেলায় কয়টি ইউনিয়ন?
চর রাজিবপুর উপজেলায় ৩টি ইউনিয়ন ও ১০২টি গ্রাম রয়েছে; এটি কুড়িগ্রামের ক্ষুদ্রতম উপজেলা।
চর রাজিবপুরের আয়তন ও জনসংখ্যা কত?
আয়তন ১১১.০৩ বর্গ কিমি; জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী জনসংখ্যা ৭৮,৩৮৩ জন।
কুড়িগ্রাম থেকে চর রাজিবপুর কীভাবে যাব?
চিলমারী নৌঘাট থেকে নৌপথে, অথবা সড়কপথে জামালপুর–বকশীগঞ্জ–রৌমারী হয়ে রাজিবপুরে যাওয়া যায়।
তারামন বিবি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
বীর প্রতীক তারামন বিবি চর রাজিবপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
তথ্যসূত্র
- চর রাজিবপুর উপজেলা তথ্য বাতায়ন (সরকারি পোর্টাল)
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো — জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২
তথ্য হালনাগাদ: সেপ্টেম্বর ২০২৬। আদমশুমারির সংখ্যা উৎসভেদে ভিন্ন হতে পারে।